কলকাতা, ৯ মার্চ: প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্য ঐতিহ্য ৬৪ যোগিনীর শক্তিশালী উত্তরাধিকারকে আধুনিক শিল্পভাষায় তুলে ধরতে কলকাতায় উদ্বোধন হল ‘Ekaa – The One’ নামের একটি জাতীয় ভ্রাম্যমাণ শিল্প প্রদর্শনী। বিশিষ্ট শিল্পী ড. বীনা এস. উন্নিকৃষ্ণনের সৃষ্ট এই প্রদর্শনীতে সমকালীন শিল্পের মাধ্যমে যোগিনী ঐতিহ্যের এক অভিনব ব্যাখ্যা দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। শহরে আয়োজিত এই প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন কনস্যুলেটের অ্যাক্টিং কনসাল সৈয়দ গারদেজি, থিম আর্টিস্ট ও বেঙ্গল ইকোসের পরিচালক অনির্বাণ দাস, রূপা পাবলিকেশনের কর্ণধার ও পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের কোষাধ্যক্ষ রাজু বর্মন এবং শিক্ষাবিদ ও অ্যাবস্ট্র্যাক্ট এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পী শিলাজিত ঘোষ।

প্রদর্শনীতে ৬৪টি সমকালীন চিত্রকর্মের মাধ্যমে যোগিনীদের রূপায়ণ করেছেন ড. উন্নিকৃষ্ণন, যা সম্পূর্ণ করতে তাঁর প্রায় পাঁচ বছর সময় লেগেছে। এই প্রকল্পটি দেশের ১৬টি রাজ্য জুড়ে একটি বৃহৎ শিল্পযাত্রার অংশ হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছে এবং এ বছরের শুরুতে কোচিতে এর সূচনা হওয়ার পর ইতিমধ্যেই একাধিক শহর ঘুরে কলকাতায় পৌঁছেছে। আয়োজকদের মতে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য যোগিনীদের শুধু পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে নয়, বরং নারীশক্তি, জ্ঞান ও মহাজাগতিক দর্শনের এক গভীর প্রতীক হিসেবে সমকালীন দর্শকদের সামনে তুলে ধরা। ইতিহাসবিদদের মতে নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত যোগিনী মন্দিরগুলি ছিল বৃত্তাকার ও উন্মুক্ত স্থাপনা, যেখানে প্রচলিত ধর্মীয় কাঠামোর বাইরে নারীশক্তি ও জ্ঞানচর্চার বিশেষ স্থান ছিল। সেই ঐতিহ্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে শিল্পী তাঁর চিত্রকর্মে সরাসরি প্রতিকৃতি আঁকার বদলে আধুনিক ভিজ্যুয়াল ভাষায় যোগিনীদের পুনর্নির্মাণ করেছেন, যা আজকের সময়ে লিঙ্গ, ঐতিহ্য ও পরিচয় নিয়ে চলমান আলোচনার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।

শিল্পীর নিজস্ব সৃজনপ্রক্রিয়ায় প্রতিটি চিত্রকর্মের সূচনা হয় যোগিনীর চোখ এঁকে, যার মাধ্যমে তিনি প্রথমে একটি ব্যক্তিগত সংযোগ তৈরি করেন এবং পরে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ রূপ নির্মাণ করেন। ড. বীনা এস. উন্নিকৃষ্ণন জানান, যোগিনীরা কেবল পৌরাণিক চরিত্র নন, তারা নারীশক্তি, দেহচেতনা ও জ্ঞানের এক গভীর দর্শনকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং ‘Ekaa – The One’-এর মাধ্যমে সেই নীরব ইতিহাসকে আধুনিক শিল্পভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করা হয়েছে। সম্পূর্ণ অ-বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে আয়োজিত এই প্রদর্শনী সকল দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং কোনও চিত্রকর্ম বিক্রির জন্য রাখা হয়নি, যাতে যোগিনী ঐতিহ্যকে বৃহত্তর জনসাধারণের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়া যায়। কলকাতায় প্রদর্শনীর আগমনের মধ্য দিয়ে প্রাচীন নারীজ্ঞান ও সমকালীন শিল্পচর্চার মধ্যে এক তাৎপর্যপূর্ণ সংলাপের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন শিল্পমহলের অনেকেই।
