স্তন ক্যান্সার গবেষণায় কলকাতায় বিশ্বমঞ্চ
কলকাতা, ৬ মার্চ: ভারতের অনকোলজি ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কলকাতার ইনস্টিটিউট অব ব্রেস্ট ডিজিজেস (IBDK) আয়োজিত হল বিশ্বখ্যাত St. Gallen International Breast Cancer Conference-এর ভারত সংস্করণ, তাজ তাল কুটিরে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও ভারতীয় অনকোলজিস্ট, গবেষক এবং চিকিৎসকরা একত্রিত হয়ে স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা, গবেষণা এবং সবার জন্য সমান স্বাস্থ্যসেবার বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। স্তন ক্যান্সার চিকিৎসা ও গবেষণার ক্ষেত্রে St. Gallen Conference বিশ্বব্যাপী অন্যতম প্রভাবশালী মঞ্চ হিসেবে পরিচিত, যেখানে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ মতৈক্য গড়ে তোলেন। কলকাতায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ১০ জনেরও বেশি আন্তর্জাতিক ফ্যাকাল্টি, ২০০-রও বেশি জাতীয় বিশেষজ্ঞ এবং ৫০০-রও বেশি প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন, যা ভারতের অনকোলজি গবেষণার ক্রমবর্ধমান শক্তিকে তুলে ধরে। ২০২৪ সালের একটি জাতীয় গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে স্তন ক্যান্সারের প্রকোপ ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; ১৯৯০ সালে প্রতি এক লক্ষ মহিলার মধ্যে ১৩ জন আক্রান্ত হওয়ার হার ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯.৪ জনে। সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল Project Pink Army-এর সূচনা, যা ক্যান্সার সচেতনতা ও রোগী সহায়তার জন্য সমাজভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী আন্দোলন হিসেবে কাজ করবে। এটি IBDK-এর পূর্ববর্তী উদ্যোগ Project Pink Alert-এর ধারাবাহিকতা, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্যান্সার সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন ক্যান্সার সচেতনতা ওয়েবিনারে ১.৮ লক্ষেরও বেশি অংশগ্রহণকারী যুক্ত হয়ে Guinness World Records-এ স্থান পেয়েছিল। সুইজারল্যান্ডের St. Gallen-এর প্রফেসর বিট থুরলিমান বলেন, স্তন ক্যান্সার গবেষণার বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে রোগীদের উপকারে আসা উচিত এবং এই ধরনের আন্তর্জাতিক মঞ্চ বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকদের মধ্যে অর্থবহ সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করে। প্যারিসের প্রফেসর এটিয়েন ব্রেন বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসার আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ধরনের মতবিনিময় বৈজ্ঞানিকভাবে শক্তিশালী এবং বাস্তবসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সুইজারল্যান্ডের প্রফেসর জেন্স হাউবার জানান, স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় সার্জারি, রেডিয়েশন অনকোলজি এবং সিস্টেমিক থেরাপির সমন্বিত কাজ অত্যন্ত জরুরি এবং আন্তর্জাতিক আলোচনা রোগীদের জন্য দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব করে। সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শতাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের উপস্থাপনা এবং ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক অনুদান কর্মসূচির মাধ্যমে বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রকল্পকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয় এবং পাঁচজন তরুণ গবেষককে ২০২৭ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিতব্য St. Gallen International Breast Cancer Conference-এ তাদের গবেষণা উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। এছাড়াও সম্মেলনে Asian Cancer Consensus Meet অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বিশেষ চ্যালেঞ্জ ও অনিষ্পন্ন চিকিৎসা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হয় এবং এর ফলাফল একটি আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। একাডেমিক আলোচনার পাশাপাশি সম্মেলনে ক্যান্সার চিকিৎসার একটি বড় সমস্যা—চিকিৎসা প্রাপ্তির সুযোগ—নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞরা জানান আর্থিক সীমাবদ্ধতা, ভৌগোলিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ঘাটতি এখনও অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে। ইনস্টিটিউট অব ব্রেস্ট ডিজিজেস, কলকাতার ডিরেক্টর ডা. সৌমেন দাস বলেন, কলকাতায় St. Gallen Conference আয়োজনের ফলে ভারতীয় চিকিৎসক ও গবেষকরা আন্তর্জাতিক একাডেমিক আলোচনার কেন্দ্রে আসার সুযোগ পাচ্ছেন এবং ভারতীয় তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। একই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর ডা. তন্ময় কুমার মণ্ডল জানান, এই উদ্যোগ শুধু একাডেমিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গবেষণায় অর্থায়ন, তরুণ গবেষকদের উৎসাহ এবং আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ, গবেষণা অনুদান, চিকিৎসা নির্দেশিকা নিয়ে মতৈক্য এবং সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচিকে একত্রে নিয়ে এই সম্মেলন কলকাতাকে বৈশ্বিক ক্যান্সার গবেষণা ও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরল এবং ভারত ও এশিয়ায় সমতাভিত্তিক স্তন ক্যান্সার চিকিৎসার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হল।
