শুধু ত্বকে নয়, মনে দাগ ফেলে একজিমা!

তাপস রায়,কলকাতা, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: শরীরে র‍্যাশ, অসহ্য চুলকানি কিংবা ত্বকে দাগ—চোখে দেখা এই উপসর্গগুলির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে দীর্ঘ এক মানসিক লড়াই। একজিমা শুধু ত্বকের রোগ নয়; বারবার চুলকানি, ঘুমের ব্যাঘাত, রোগ ফিরে আসার আশঙ্কা, সামাজিক অস্বস্তি এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট একজন রোগীর স্বাভাবিক জীবনকেও বদলে দিতে পারে। বিশ্ব একজিমা দিবসে তাই ‘Beyond the Rash: Understanding the Hidden Burden of Eczema’ বার্তায় একজিমার এই অদৃশ্য বোঝার দিকেই নজর ফেরাল Society for Eczema Studies (SES)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে Atopic Dermatitis একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত ত্বকের সমস্যা, যার সূচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শৈশবে। ভারতে এর প্রকোপ প্রায় ১১ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছে SES। ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক শিশু ও পরিবারকে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু রোগের চিকিৎসা শুধু ফ্লেয়ার-আপের সময় ওষুধ ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা, নিয়মিত ত্বকের যত্ন, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং রোগী ও পরিবারের মানসিক সহায়তা।

এই লক্ষ্যেই ভারতীয় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের উদ্যোগে Society for Eczema Studies গড়ে উঠেছে। Atopic, Contact, Occupational, Industrial ও Environmental Dermatitis-সহ একজিমার বিভিন্ন ধরন নিয়ে গবেষণা, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে এই সংগঠন। জাতীয় সম্মেলন, CME, কর্মশালা, কুইজ, ফেলোশিপ ও বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পাশাপাশি একজিমার প্রকোপ, চিকিৎসার ধরন ও ফলাফল নিয়ে India-specific data তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

SES-এর সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে মানবিক দিকটিও। ডা. সন্দীপন ধর-এর নেতৃত্বে ডা. রঘুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়, ডা. রাজীব মালাকার, ডা. অভিজিৎ সাহা এবং ডা. সাফিয়া বশির-সহ চিকিৎসকরা একজিমা নিয়ে সামাজিক ভুল ধারণা ও রোগীদের প্রতি অযাচিত সংকোচ দূর করার লক্ষ্যে কাজ করছেন।

একটি পাঁচ বছরের শিশুর ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, ত্বকের রোগ কীভাবে শিশুমনের উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। স্কুলে সদ্য পা রাখা শিশুটি বারবার চুলকানি ও র‍্যাশের সমস্যায় সহপাঠীদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে এবং স্কুলজীবন উপভোগ করতে সমস্যায় পড়ছিল। একের পর এক চিকিৎসকের কাছে যাওয়ায় তার মনে তৈরি হচ্ছিল ‘আমি বোধহয় সবসময়ই অসুস্থ’। সঠিক কাউন্সেলিং এবং পরিবারের সচেতনতার মাধ্যমে সেই ধারণা বদলাতে শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা, basic skin care এবং রোগকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা শিশুটির জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

অন্য একটি ঘটনায় দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি। ৬৫ বছরের এক বিধবা ব্যক্তি, যিনি টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও অ্যাজমাতেও আক্রান্ত, একজিমার বারবার তীব্র ফ্লেয়ার-আপে ভুগছিলেন। সন্তানরা কর্মসূত্রে দূরে থাকায় একাকীত্ব তাঁর সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। একাধিক ওষুধ চলার কারণে চিকিৎসা মেনে চলাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের সহানুভূতিশীল আচরণ, নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসার ফলে ধীরে ধীরে তাঁর চিকিৎসা মেনে চলার প্রবণতা বাড়ে। উন্নতি ঘটে শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি মানসিক স্থিতিতেও।

SES-এর প্রেসিডেন্ট ডা. সন্দীপন ধর বলেন, “একজিমার বোঝা ত্বকের দৃশ্যমান সমস্যার অনেক বাইরে। দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি, ঘুমের ব্যাঘাত, বারবার ফ্লেয়ার-আপ এবং রোগ ফিরে আসার আশঙ্কা একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক, পড়াশোনা, কাজ এবং দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই একজিমার যত্ন শুধু উপসর্গ দেখা দিলে ক্রিম ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। রোগী ও পরিবারকে রোগটির দীর্ঘস্থায়ী প্রকৃতি বুঝতে হবে, ট্রিগার চিনতে হবে এবং উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে হবে।”

বিশ্ব একজিমা দিবসে SES-এর বার্তা স্পষ্ট—একজিমাকে শুধু ‘ত্বকের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে চলবে না। রোগীর যন্ত্রণা, আত্মবিশ্বাস, পারিবারিক জীবন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। সচেতনতা, সহানুভূতি ও সঠিক চিকিৎসার হাত ধরেই একজিমার সঙ্গে লড়াই করা মানুষ আবার ফিরে পেতে পারেন স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *