তাপস রায়, কলকাতা, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে সার্থক করে তোলার নেপথ্যে যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম, সৃজনশীলতা ও দক্ষতা—সেই কারিগরদের সম্মান জানাল মণিপাল হাসপাতাল কলকাতা। ‘পুজোর রূপকার ২.০’ উদ্যোগের মাধ্যমে কুমোরটুলির মৃৎশিল্পী, চন্দননগরের আলোকশিল্পী, ঢাকি এবং বিভিন্ন পুজো কমিটির প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত হল বিশেষ সম্মাননা অনুষ্ঠান।

দুর্গাপুজো শুধু উৎসব নয়, বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২১ সালে ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় জায়গা করে নেয় দুর্গাপুজো। হাজার হাজার প্যান্ডেলের শিল্পসৌন্দর্য, প্রতিমার নিখুঁত নির্মাণ, আলোর কারুকাজ এবং ঢাকের ছন্দের আড়ালে রয়েছেন বহু প্রজন্ম ধরে কাজ করে আসা অসংখ্য শিল্পী ও কারিগর। তাঁদের সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমেই পূর্ণতা পায় দুর্গোৎসব।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে। উপস্থিত ছিলেন মণিপাল হাসপাতাল কলকাতার নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, কুমোরটুলি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং কলকাতায় মণিপাল হাসপাতাল গোষ্ঠীর বিভিন্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা। এরপর নার্সিং দলের পক্ষ থেকে পরিবেশিত হয় বিশেষ দেবী-বরণ অনুষ্ঠান।

স্বাগত ভাষণে মণিপাল হাসপাতাল ইস্ট-এর রিজিওনাল ডিরেক্টর ডা. অয়নাভ দেবগুপ্ত দুর্গাপুজোর নেপথ্যের কারিগরদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তুলতে এই শিল্পী ও কারিগরদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এরপর শুরু হয় বিশেষ সম্মাননা পর্ব। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পী, ঐতিহ্যবাহী ঢাকি এবং চন্দননগরের আলোকশিল্পীদের হাতে স্মারক ও উত্তরীয় তুলে দিয়ে তাঁদের সম্মানিত করেন মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা।

সম্মানিতদের মধ্যে ছিলেন কুমোরটুলি সর্বজনীনের সম্পাদক সমর মিত্র ও কার্যকরী সভাপতি দেবাশিস ভট্টাচার্য। এছাড়াও ছিলেন কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সংস্কৃতি সমিতির সহকারী সম্পাদক ও মৃৎশিল্পী বাবু পাল, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মৃৎশিল্পী মালা পাল ও ঝুলন পাল, প্রবীণ মৃৎশিল্পী নিমাই পাল এবং এশিয়ান পেইন্টস পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী নব পাল, সৌমেন পাল ও সনাতন পাল। তাঁদের পাশাপাশি কাকলি পাল, অরূপ পাল, পশুপতি রুদ্র পাল, সঞ্জয় পাল, রমিত পাল, ইন্দ্রজিৎ পাল, রঞ্জিত সরকার, বঙ্কিম পাল, দীপঙ্কর পাল, ভানু রুদ্র পাল, সুজিত পাল, প্রদীপ দে, রুদ্রজিৎ পাল, সুভাষ পাল ও সমীর পালকেও সম্মানিত করা হয়।পুজো কমিটিগুলির প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন সম্পাদক চন্দ্রনাথ দে এবং কোষাধ্যক্ষ সানু বিশ্বাস। চন্দননগরের আলোকশিল্পী তপন ঘোষ, তপস ঘোষ, অসীম দে, দিব্যেন্দু বিশ্বাস এবং অমিয় দাসকেও তাঁদের শিল্পকুশলতা ও অবদানের জন্য সম্মান জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে হৃদ্স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতনতার বার্তা দেন মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুরের কনসালট্যান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডা. পারিজাত দেব চৌধুরী। দীর্ঘক্ষণ কাজ, শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং অনিয়মিত জীবনযাত্রা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে তিনি জানান। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সতর্কতা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার উপর জোর দেন তিনি।মৃৎশিল্পীদের শারীরিক সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুরের সিনিয়র কনসালট্যান্ট, অর্থোপেডিক্স ডা. সুতনু হাজরা জানান, প্রতিমা তৈরির সময় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, ঝুঁকে কাজ করা, ভার তোলা এবং একই ধরনের নড়াচড়া থেকে পেশি, অস্থিসন্ধি ও মেরুদণ্ডে চাপ পড়তে পারে। সঠিক ভঙ্গিতে কাজ করা, নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন এবং মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসের কনসালট্যান্ট—গাইনিকোলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স ডা. শিল্পিতা বন্দ্যোপাধ্যায় নারী শিল্পীদের স্বাস্থ্যসচেতনতার উপর গুরুত্ব দেন। কাজের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অনেক সময় মহিলারা নিজেদের স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেন না। রক্তাল্পতা, পুষ্টির ঘাটতি ও অন্যান্য স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত সমস্যা উপেক্ষা না করে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।অন্যদিকে, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও হেড—অ্যাক্সিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি কেয়ার ডা. ইন্দ্রনীল দাস শিল্পীদের কাজের পরিবেশে নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেন। দীর্ঘসময় কাজ, শারীরিক পরিশ্রম, গরম, ধুলো এবং বিভিন্ন উপকরণের সংস্পর্শে থাকার কারণে সতর্কতা, পর্যাপ্ত জল পান এবং চোট বা হঠাৎ শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

পুজোর রূপকার ২.০’-এর মাধ্যমে মণিপাল হাসপাতাল কলকাতা শুধু দুর্গাপুজোর উৎসবকে নয়, সেই উৎসবের নেপথ্যে থাকা মানুষগুলিকেও সামনে তুলে ধরার বার্তা দিয়েছে। যাঁদের হাতের ছোঁয়ায় প্রতিমা, আলো, মণ্ডপ ও ঢাকের ছন্দে প্রাণ পায় বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব, তাঁদের সম্মান জানানোর পাশাপাশি নিজেদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এই উদ্যোগে।