মণিপুরী নৃত্য থেকে মুভমেন্ট থেরাপির অন্য যাত্রা শ্রবণা মিত্র দাসের
তাপস রায়:এই প্রতিবেদন লেখার শুরুতেই বিশ্বকবির লেখা বিচিত্র পর্যায়ে লেখা নৃত্যের ভাবনায় লেখা – নৃত্যের তালে তালে…… হে নটরাজ , গান টি বড় বেশিকরে মনে পড়ে গেল।তাই বোধহয় বলা যায়,নৃত্য শুধু মঞ্চে পরিবেশনের শিল্প নয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আত্মপ্রকাশেরও এক শক্তিশালী মাধ্যম—এই ভাবনাকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন মণিপুরী নৃত্যশিল্পী শ্রবণা মিত্র দাস। পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মণিপুরী নৃত্যের সঙ্গে যুক্ত শ্রবণার শিল্পশিক্ষার শুরু মণিপুরের ঐতিহ্যবাহী গুরু-শিষ্য পরম্পরায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি হংকং, ম্যাকাও, মঙ্গোলিয়া ও আমেরিকাতেও নৃত্য পরিবেশন করেছেন তিনি।

ভারত সরকারের জাতীয় বৃত্তির প্রাপক শ্রবণা ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্ক পরিষদ (ICCR) এবং দিল্লি দূরদর্শনের তালিকাভুক্ত শিল্পী। তবে তাঁর কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখন কলকাতায়। সল্টলেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘রিয়ম সোসাইটি ফর মণিপুরী ডান্স অ্যান্ড মুভমেন্ট থেরাপি’।শ্রবণার উদ্যোগে মণিপুরী নৃত্যের ছন্দ, বৃত্তাকার ও কোমল গতিবিধি এবং শরীরের সচেতন নড়াচড়াকে মানুষের আত্মপ্রকাশ, আত্মবিশ্বাস ও সুস্থতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, “নড়াচড়া শুধু শিল্প নয়, এটি আত্মার ভাষা। যখন শব্দ থেমে যায়, তখন শরীর কথা বলে।”

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পাশাপাশি মানসিক চাপ ও আবেগগত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়েও কাজ করেন শ্রবণা। হাততালি, ছন্দ, পুনরাবৃত্তিমূলক চলন, ওড়না, ফিতে কিংবা কাঠির মতো সহজ উপকরণ ব্যবহার করে অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরি করা হয়। তাঁর মতে, এর ফলে নিজের শরীরকে অনুভব করা, ভারসাম্য ও সমন্বয় এবং আত্মবিশ্বাসের মতো বিষয়গুলিতে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।অন্তর্ভুক্তি মানে শুধু সবাইকে মঞ্চে জায়গা দেওয়া নয়। প্রত্যেকে যেন অনুভব করেন, এই মঞ্চে তাঁরও জায়গা রয়েছে—সেটাই আসল,” বলেন শ্রবণা।রিয়ম সোসাইটির মাধ্যমে নৃত্যশিক্ষা, কর্মশালা, পরিবেশনা এবং বিভিন্ন মুভমেন্ট-ভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মণিপুরী নৃত্যের ঐতিহ্যের সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের সংযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

নৃত্য ও সমাজের প্রতি অবদানের জন্য বিভিন্ন সময়ে স্বীকৃতিও পেয়েছেন শ্রবণা। জাতীয় বৃত্তির পাশাপাশি তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ভোকেশনাল এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড, ড. সরোজিনী নাইডু ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড এবং পদ্মাবতী রাষ্ট্রীয় পুরস্কার।

নৃত্যের দীর্ঘ পরম্পরা থেকে মানুষের আরও কাছে পৌঁছনোর এই প্রয়াসে শ্রবণার কাছে শিল্পের অর্থ তাই একটাই—নিজেকে প্রকাশ করা এবং অন্যের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা।

