বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসে সচেতনতার বার্তা কলকাতা হার্ট লাং সেন্টারের
তাপস রায়,কলকাতা, ৮ সেপ্টেম্বর: হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো জটিল অসুস্থতা থেকে সুস্থ জীবনে ফিরতে চিকিৎসার পাশাপাশি রিহ্যাবিলিটেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু রোগ নিরাময় নয়, রোগীর শারীরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতেও রিহ্যাবিলিটেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উপলক্ষে এমনই সচেতনতার বার্তা উঠে এল কলকাতা হার্ট লাং সেন্টারের উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে।

এদিন সার্ভে পার্কের ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন ক্লাবে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এবারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘Cardiovascular Disease and Stroke: Prevention, Management and Rehabilitation’। হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক জীবনযাত্রার অভ্যাস এবং রোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরাই ছিল অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ পি কে হাজরা। উপস্থিত ছিলেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের অধীন প্রণবানন্দ ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজির ডিরেক্টর অধ্যাপক প্রবীর কুমার দে, বিশিষ্ট নিউরোলজিস্ট ডাঃ জয়দীপ বিশ্বাস, কলকাতা হার্ট লাং সেন্টারের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ সুনীপ ব্যানার্জি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের প্রধান ডাঃ প্রশান্ত বর্মা, ডাঃ সুব্রত দত্ত, ডাঃ আদিল বশির ওয়াসিল, ডাঃ ইন্দ্রনীল দত্ত, কার্ডিওপালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের রিহ্যাব স্পেশ্যালিস্ট ডাঃ সত্যজিৎ বেহেরা, পালমোনোলজি বিভাগের চিকিৎসক অনির্বাণ দেব এবং কার্ডিওভাস্কুলার সার্জারি বিভাগের অধিকর্তা ডাঃ অর্ণব মাইতি-সহ একাধিক বিশিষ্ট চিকিৎসক ও রোগী।

অনুষ্ঠানের সূচনার পর কলকাতা হার্ট লাং সেন্টারের বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করেন ডাঃ সত্যজিৎ বেহেরা।ডাঃ পি কে হাজরা হৃদরোগ প্রতিরোধ ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি রিহ্যাবিলিটেশনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ও পেশির কর্মক্ষমতা কমতে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি কার্ডিওপালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন রোগীর শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। হার্ট সার্জারি, হার্ট বা হাঁটু প্রতিস্থাপন, COPD, অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, প্যারালিসিস কিংবা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রিহ্যাবিলিটেশনের প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি জানান।

অধ্যাপক প্রবীর কুমার দে বলেন, কলকাতা হার্ট লাং সেন্টার ও ভারত সেবাশ্রম সংঘের যৌথ উদ্যোগে দুঃস্থ ও প্রান্তিক মানুষের কাছে ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশনের পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মানুষের সেবা ও কল্যাণের উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে সকলের সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।ডাঃ সুনীপ ব্যানার্জি বলেন, শুধুমাত্র ‘ফিজিওথেরাপি’ নয়, সামগ্রিকভাবে ‘রিহ্যাবিলিটেশন’-এর ধারণাকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। রোগীর শারীরিক সক্ষমতা বজায় রেখে কীভাবে তাঁকে স্বাভাবিক জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসনের গুরুত্ব তুলে ধরে নিউরোলজিস্ট ডাঃ জয়দীপ বিশ্বাস বলেন, নিউরো রিহ্যাবিলিটেশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোক নিয়ে মানুষের মধ্যে এখনও নানা ধরনের ভয় ও ভুল ধারণা রয়েছে। স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সঠিক রিহ্যাবিলিটেশন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।কার্ডিওপালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন স্পেশ্যালিস্ট ডাঃ সত্যজিৎ বেহেরা বলেন, রিহ্যাবিলিটেশনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সমাজে এখনও যথেষ্ট সচেতনতার অভাব রয়েছে। হৃদরোগে কার্ডিওলজিস্ট বা শ্বাসকষ্টে পালমোনোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া হলেও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারে কার্ডিওপালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশনের গুরুত্ব অনেকেই জানেন না। বিশেষ করে ফুসফুসের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং হৃদযন্ত্রের জটিল অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও জানান, অসুস্থতার মধ্যেও কীভাবে রোগীরা নিজেদের সুস্থ ও সক্রিয় রাখতে পারেন, সেই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করাই এই অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য। কলকাতা হার্ট লাং সেন্টারে কার্ডিওভাসকুলার প্রিভেনশন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং রিহ্যাবিলিটেশনকে একত্রিত করে আন্তর্জাতিক মানের কম্প্রিহেনসিভ ফিজিক্যাল থেরাপির পরিষেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন পর্ব ছিল রোগীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়। টেগোর পার্কের বাসিন্দা এবং রিহ্যাবিলিটেশনের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠা COPD আক্রান্ত পৌলমী মুখার্জি স্বকণ্ঠে সুরেলা গান পরিবেশন করেন। তাঁর পরিবেশনা উপস্থিত সকলের মন ছুঁয়ে যায় এবং সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে রোগীর আত্মবিশ্বাস ও জীবনযাত্রায় কীভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে, তারই প্রতিফলন দেখা যায়।

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে কেক কেটে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উদযাপন করা হয়। এরপর ডিগনিটি ফাউন্ডেশনের প্রবীণ সদস্যদের ‘বন্দে মাতরম্’-এর সুরে নৃত্য পরিবেশনা অনুষ্ঠানে তৈরি করে এক আবেগঘন ও আনন্দমুখর পরিবেশ। চিকিৎসক, রোগী ও উপস্থিত দর্শকদের মন জয় করে নেয় এই বিশেষ পরিবেশনা।সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান শুভাংক্ষী দাস।

